তিন D (Doctor, Diagnosis Center ও Drugs) থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন - Dr Aabdus Salaam #draabdussalaam # hellodoctorplc
মানবদেহ স্রষ্টার এমন এক অনন্য সৃষ্টি, এমন এক নিখুঁত যন্ত্র- যা নিজেই নিজের সুস্থতা অটুট রাখতে পারে! রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের শরীরের ভেতরেই বিদ্যমান, এজন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উপাদানগুলো শরীর প্রকৃতি থেকে আহরণ করে। দরকার শুধু সঠিক খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াকে সচল রাখা আর এমন কিছু না করা যাতে মানবদেহের প্রাকৃতিক নিয়ম লঙ্ঘিত হয়। কিন্তু ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শ খাদ্যজ্ঞানের অভাবে অধিকাংশ মানুষ এখানেই ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলে। পরিণামে আমাদেরকে অকালে নানা রোগে ভূগতে হয় এবং চিকিৎসার পেছনে জীবনের শেষ সঞ্চয় পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েও অনেক সময় শেষ রক্ষা হয় না (অথচ সময় থাকতে এসব বিষয়ে কেউ সদুপদেশ দিতে এলে উল্টো তাঁর যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলি)!
যিনি একটি মানবদেহের মালিক, তিনিই এই দেহ ও দেহের সুরক্ষা বিষয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন। তবে সবার আগে মানবদেহ ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানার জন্য যথেষ্ট পড়াশুনা করে নেওয়া উচিত। সেটা যে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই হতে হবে- প্রকৃতিতে এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে এই ধারণা ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত যে, চিকিৎসাবিজ্ঞান শুধুমাত্র চিকিৎসাবিদ্যায় পড়ালেখা করেছেন- এমন মানুষদের অধিকারভূক্ত; বাকি সবাই তাঁদের রোগী! ডাক্তারগণ এই দেহটিকে সুস্থ করার নামে ইচ্ছেমতোন ওষুধ (আসলে ড্রাগ) দেহের ভেতরে ঢোকাবেন, কিন্তু তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না, কৈফিয়ৎ তলব তো আরো পরের ব্যাপার!
শুরুতেই যে বিষয়টি স্পষ্ট করা দরকার, তাহলো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আমরা শুধু চাই প্রকৃতির সেরা সৃষ্টি মানুষকে প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে আনতে, অন্তত প্রকৃতির কাছাকাছি রাখতে। কেননা এছাড়া অন্যকিছুতে মানুষের চূড়ান্ত মুক্তি নেই।
মানবদেহ আসলে রূপান্তরিত খাদ্যের সমন্বয়। আমরা খাদ্য, পানীয় আর নিঃশ্বাসের মাধ্যমে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, তার সমন্বয়েই বেঁচে থাকি। আমরা যা কিছু খাই, দেহটা ঠিক তাই! এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নিয়ম ন্যূনতম লঙ্ঘিত হলেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে বাধ্য। এটা বোঝার জন্য জনে জনে ডাক্তার হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে প্রকৃতির ইশারা বুঝে খাবার খেলে যে কেউ মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের ডিজেনারেটিভ রোগবালাই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না, দেহ থাকবে অটুট ও সুরক্ষিত! অন্তত আজকের জামানায় অপরিহার্য তিন-ডি যথাক্রমে ডাক্তার, ডায়গনসিস সেন্টার ও ড্রাগ থেকে যে দূরে থাকতে পারবেন, সে কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যাধারী ডাক্তারগণ এনাটমি ও ফিজিওলজি বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয় করেন। তারপর চিকিৎসা হিসেবে বিভিন্ন ওষুধ (আসলে ড্রাগ; যা কেমিক্যাল থেকে উৎপাদিত) প্রয়োগ করেন। কিন্তু মানবদেহের প্রাকৃতিক রীতি-নীতি আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে আলোচিত (পড়ানো) হয় না। আরো আশংকার কথা হলো- আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মুল লক্ষ্য মানবসেবা নয়, ব্যবসা! ফলে গবেষণাগারে একটার পর একটা নতুন রোগের আবিষ্কার হচ্ছে (সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে করোনাতঙ্ক) আর তার প্রতিকারের নামে চলছে ওষুধ বিক্রির করে মুনাফা অর্জনের রমরমা বাণিজ্য।
কেউ নিজের থেকে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে না দিলে মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ কাউকে ডাক্তার বানানো/হওয়া থেকে বঞ্চিত করে না। একবারে না পারলে বারবার পড়িয়ে মুখস্থ করিয়ে ঠিকই এমবিবিএস পাস করিয়ে ছাড়ে! তারপর ইন্টার্নশিপ করার সময় কোন লক্ষণ দেখা গেলে কোন ওষুধ কী মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে আর পরিস্থিতি খুব বেশি জটিল হলে রোগীকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে কিভাবে প্রাকৃতিক নিয়মে দেহে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করাতে হবে- সেই বিদ্যার অনুশীলন করিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদানের আনুষ্ঠানিক অধিকারপত্র (লাইসেন্স) দিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
MBBS সনদপত্র আর ডাক্তারি করতে পারার লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর নবীন ডাক্তারগণ ওষুধ কোম্পানির ছড়ানো-ছিটানো সূক্ষ্ণ জালে এমনভাবে আটকা পড়ে যান যে, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের শেখানো বুলির বাইরে নতুন করে চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞানচর্চার সুযোগই পান না! অধিকাংশ চিকিৎসক রোগী দেখতে এতো স্যবস্ত সময় পার করেন যে, আলাদাভাবে পড়াশুনা করার মতো যথেষ্ট সময় তাঁদের হাতে থাকে না। এটা কিন্তু BBA পড়া নয় যে, একবার পড়িয়ে, মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষা নিয়েই দায়-দায়িত্ব শেষ!
যতই দিন যাচ্ছে, নিত্য-নতুন জীবাণু ও রোগের সন্ধান মিলছে; তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ওষুধের সংখ্যাও। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক চিকিৎসকের পক্ষে প্রতি পাঁচাটি ওষুধের মধ্যে অন্তত একটি ওষুধের লাইসেন্সিং স্ট্যাটাস নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে ডাক্তারদের জন্য ড্রাগ রিপ্রেজেন্টেটিভদের মতামতই শিরোধার্য (যদিও আমরা আম-জনতা স্রষ্টার পরে ডাক্তারগণকেই ‘জীবনদাতা’ জ্ঞান করেন)! আসলে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নেপথ্যে থেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে হাসপাতাল-ক্লিনিক আর ওষুধ কোম্পানিগুলো!
পৃথিবীর কোনো দেশে ডাক্তারগণ ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের ব্র্যান্ড-নাম লেখার অধিকার রাখেন না। তাঁদেরকে লিখতে হয় ওষুধের জেনেরিক-নাম। রোগী ওই ব্যবস্থাপত্র নিয়ে কোনো অনুমোদিত ড্রাগ-স্টোরে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক সনদপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট প্রয়োজনীয় ওষুধ নির্ধারণ করেন। কিন্তু আমাদের দেশে ডাক্তারগণই ওষুধের ব্র্যান্ড-নাম লিখে দেন। বলাবাহুল্য যে, এর নেপথ্যে ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি বিশাল অংকের টাকার লেনদেন-এর খেলা চলে (যে কারণে ওষুধের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করলেও অনেক ডাক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন)!
এরশাদ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন, গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ তখন জাতীয় ওষুধ-নীতি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন- চিকিৎসকেরা যেন প্রেসক্রিপশনে ওষুধের জেনেরিক-নাম লেখেন। কিন্তু তাতে করে ডাক্তারদের ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। সে কারণে চিকিৎসক সমাজ ও ওষুধ কোম্পানিগুলো সন্মিলিতভাবে প্রণীত ওষুধ-নীতির বিরোধিতা করে এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ডা. জাফরুল্লাহ’র চিকিৎসক সমিতির সদস্যপদ বাতিল করা হয় (যদিও তিনি সঠিক কাজটাই করেছিলেন)।
বাংলাদেশের ওষুধ বিপণন প্রক্রিয়ার পুরোটাই অনিয়ম ও অনৈতিকতায় ভরপুর! অতীব দুঃখজনক ও লজ্জাজনক হলেও সত্যি যে, ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করানোর জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত ডাক্তারদের মোটা অঙ্কের কমিশন ও উপহারসামগ্রী দেয়। এর বিনিময়ে ডাক্তারগণ রোগীদেরকে সুনির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির ওষুধের নামই লিখে দেন! হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলোতে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড়ে হাঁটা-চলাই দায়! হাসপাতাল চত্বরের পার্কিং জোন ওষুধ কোম্পানির মটর সাইকেল-এ ঠাসা। তাদের চাপে রোগীদের গাড়ি রাখার জায়গা থাকে না!
বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ওষুধ বিপণন চলছে- এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডাক্তারদের ঘুষ দেওয়া ছাড়া এই দেশে ওষুধের বিপণন হয় না! এটা সম্পূর্ণ অবৈধ তৎপরতা, যা অবিলম্বে (আইন জারি করে) বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
একজন বিক্রয়বিদ হিসেবে বলতে পারি- মোটা অঙ্কের কমিশন আর উপহারসামগ্রী দিয়ে বিক্রি করা তথা বাড়ানো নিকৃষ্টতম বিক্রয় কৌশল! বিক্রয় বাড়ানোর অসংখ্য নিয়মতান্ত্রিক কৌশল রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে সেসবের কোনো প্রয়োগ নেই। কোনোপ্রকার অবৈধ লেনদেন ছাড়াও যে বিক্রির প্রসার ঘটানো সম্ভব- সেদিকে কারো নজর নেই (আন্তরিক ইচ্ছার ঘাটতিও দৃশ্যমান)।
কমিশন দিয়ে প্রেস্ক্রিপশন লেখানোর ধান্দাবাজি বন্ধ করা গেলে অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানির বিক্রি অর্ধেক-এ নেমে আসবে। কিন্তু যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে দিলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মহার বেড়ে যাাবে! পরিণামে মানবসভ্যতা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে।
ওষুধ প্রশাসনের সাবেক এক পরিচালকের তথ্য মোতাবেক, ”দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের মোট বিক্রির ১০% অর্থ চিকিৎসকদের ঘুষ বা কমিশন দেওয়া বাবদ ব্যয় করে।” প্রশ্ন হলো- যে ব্যবসায় বিপণনের (Sales)-এর মুল অস্ত্র ডাক্তারদের ঘুষ দিয়ে প্রেস্ক্রিপশন লেখানো, সেখানে ওষুধ কোম্পানিগুলোতে সুবিশাল Sales Force-এর রাখার যৌক্তিকতা কোথায়?!? আদৌ কি এর কোনো প্রয়োজন আছে? এর পরিবর্তে কিছু বিশ্বস্ত ঘুষদাতা নিয়োগ করলেই তো ঝামেলা চুকে যায়!
আমাদের দেশে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার সবচেয়ে বড় ক্ষতিসাধিত হয়েছে বেসরকারি পর্যায়ে গণহারে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়ে। নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি পর্যায়ে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকতে হবে এবং কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ শয্যা সব সময় রোগী দ্বারা পরিপূর্ণ থাকতে হবে। তাহলে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে। কিন্তু দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো’র (২৫ মার্চ ২০১৯) অনুসন্ধানে এমনও দেখা গেছে, কিছু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের নামকাওয়াস্তে হাসপাতাল থাকলেও সেখানে রোগীরা যায় না! ফলে ব্যবহারিক কার্যক্রম নির্ভর চিকিৎসা-বিদ্যাও ক্ষেত্রবিশেষে হয়ে উঠেছে স্রেফ মুখস্থ-নির্ভর বিদ্যা এবং এভাবে ফাঁকিজুকি দিয়ে পাস করে অনেকেই ডাক্তার হিসেবে সনদপত্র পেয়ে ছড়িয়ে পড়ছেন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যদিও তাদের একটা অংশ আসলে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন (‘ভূয়া ডাক্তার’ বললে অনেকে মাইন্ড করতে পারেন)! ফলে তাদের হাতে রোগীদের জীবন কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ নয়।
ডাক্তারীবিদ্যার বেহাল দশার পাশাপাশি বলতে হয় ডায়গনসিস সেন্টারগুলোর বাটপারির কথাও। অনেক তথাকথিত মানসম্পন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে র্যাব-এর অভিযানে যে ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তাতে করে কোনো রিপোর্টের ওপরেই পরিপূর্ণ ভরসা করা যায় না। অনেক মানহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নুমনা পরীক্ষা না করেই ডাক্তারের পূর্ব স্বাক্ষরিত রিপোর্ট দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও এসবের ভিত্তিতেই ডাক্তারগণ রোগীর অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন! যেখানে মেডিক্যাল রিপোর্টই ঠিক নেই, সেখানে সঠিক চিকিৎসা হবে কিভাবে?!?
প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে ওষুধের কথাও। শুনে হয়ত অবাক হবেন- চিকিৎসাশাস্ত্রের সংজ্ঞা মতে, কোনো ওষুধই নিরাপদ নয়! ওষুধ শরীরের জন্য বহিরাগত একটি রাসায়নিক পদার্থ এবং প্রত্যেকটি রাসায়নিক পদার্থেরই শরীরে কম-বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়া আছে। এগুলোকে ধর্তব্যের মধ্যে না নিলেও অনিরাপদ, অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকর ও ব্যবহার অনুপযোগী ওষুধ খাইয়ে বিশ্বের শত কোটি মানুষকে ঠকিয়ে ওষুধ কোম্পানিগুলো কিভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা করছে আর এসব ওষুধ কিনে খেয়ে সাধারণ মানুষ যেভাবে শারীরিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তথা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন- সেই বিবরণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক (পরবর্তীতে ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) ড. Muniruddin Ahmed-এর লেখা ‘সব ওষুধ নিরাপদ নয়’ (আগামী প্রকাশনী প্রকাশিত) বইটি পড়তে হবে।
রোগ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যেমন সুখকর পরিস্থিতি নয়, তেমনি ওষুধ কোনো নিরাপদ বস্তু নয়। তবু আমরা ওষুধ খাই কারণ অনেক সময় ওষুধ না খেলে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সে কারণে গ্রহণযোগ্য মাত্রার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনায় রেখেই ওষুধ দিতে/খেতে হয়। কিন্তু সব রোগে ওষুধের দরকার হয় না, এমনকি ওষুধে সব রোগের সমাধানও নেই। কিন্তু সে কথা কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে একের পর এক ওষুধ গেলানোটাই এখন ওষুধ কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আর সে কাজে সজ্ঞানে ও খানিকটা অজ্ঞানে সহযোগিতা করে চলেছেন দেশের সেরা মেধাবী সন্তানেরা- যাঁরা কিনা ডাক্তারি পাস করে ‘মানবসেবার’ লাইসেন্স নিয়েছেন!
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১৫% ওষুধই নিরাপদ নয়, যার আর্থিক মূল্য ২৫০ বিলিয়ন ডলার। আর এশিয়া-আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে ৫০% ওষুধই মানসম্মত নয়। ওষুধ কোম্পানিগুলো রোগ নিরাময়ের জন্য কাজ করে না, তাদের লক্ষ্য ওষুধের খরিদ্দার বাড়ানো। সেজন্য যদি সুস্থ মানুষকে অসুস্থ প্রমাণ করা লাগে, সে কাজেও তারা পিছ পা হয় না!
ওষুধের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো যথাসম্ভব ন্যূনতম পর্যায়ে রেখে রোগীকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সুফল প্রদানের প্রচেষ্টা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু সেখানেও ‘ব্যবসা’ ঢুকে গেছে; শুধু ঢোকেইনি, ভালোভাবে জাঁকিয়ে বসেছে! ওষুধের তাৎক্ষণিকভাবে রোগের টুটি চেপে ধরার অপূর্ব ক্ষমতাকেই আমরা শুধু আমলে নিয়ে থাকি, কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের শরীরে যে কত রকমের বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়- সেটা কেউ জানি না বা তার খবর রাখি না!
ওষুধ ভোগ্যপণ্যের মতো কোনো বিলাসী বস্তু নয়। ওষুধ সেবনে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা চিকিৎসাশাস্ত্রের অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। কিন্তু আজকের বাণিজিক দুনিয়ায় সে কথা কেউ মনেই রাখেনি, মানা তো আরো দূরের ব্যাপার। বিশেষ করে নির্বিচারে এন্টিবায়োটিক সেবন আমাদেরকে ভয়ংকর বিপদ ও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পর একদিকে লাখো কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করা গেছে, অন্যদিকে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় কত মানুষকে অকালে জীবন দিতে হয়েছে, তার ইয়াত্তা নেই। সবচেয়ে আশংকার কথা হলো- ‘প্রথম আলো’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফার্মেসিগুলোতে ভালো ওষুধের পাশাপাশি মেয়াদ-উত্তীর্ণ ওষুধও সমানতালে বিক্রি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না। এছাড়াও আছে ভেজাল ওষুধের গোপন কারখানা!
প্রিয় পাঠক, উপরের সবটুকু পড়ার পরে আপনার মাথা যদি বনবন করে না ঘুরতে শুরু না করে তো আরেকটি তথ্য উপস্থাপন করে এই নিবন্ধের ইতি টানতে চাই। বাংলাদেশে এখন ২৬৮টি নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানি আছে- সেগুলো মিলে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন করে। কিন্তু মাত্র পাঁচটি কোম্পানি এসব ওষুধের মাত্র ৩% কাঁচামাল নিজেরা তৈরি করে। বাকি কাঁচামাল দেশের বাইরে থেকে আমদানি করে আনতে হয়। অর্থাৎ ওষুধ শিল্প যত বিকশিত হবে, (সামান্য কিছু কর্মসংস্থান ব্যতিরেকে) তত বেশি কষ্টার্জিত বৈদশিক মুদ্রা হাতছাড়া হয়ে যাবে!
আমাদের দেশে ওষুধের কাঁচামাল আসে মূলত চীন ও আমেরিকা থেকে। মজার ব্যাপার হলো- আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ওষুধের চীনা কাঁচামাল মানহীন আর চীনা স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী আমেরিকান কাঁচামাল মানহীন! উভয়ের দাবি সঠিক হলে বাংলাদেশে উৎপাদিত ৯৭% ওষুধই মানহীন! এখন আপনিই সিদ্ধান্ত নিন- রোগাক্রান্ত হয়ে কি হাসপাতাল-ক্লিনিক অথবা ডাক্তারখানায় দৌড়াদৌড়ি করবেন, নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে নিয়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে নিজেই নিজের ও পরিবারের সুস্থতা সুনিশ্চিত করবেন?